আখ চাষের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি কোনটি এবং আখ চাষ পদ্ধতি বিস্তারিত দেখুন

প্রিয় পাঠক, আপনারা হয়তো অনেকেই ইক্ষু বা কুশার অথবা আখ চাষ করতে চাচ্ছেন , কিন্তু ইক্ষু বা কুশার অথবা আখ চাষ পদ্ধতি এবং আখ চাষের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি সম্পর্কে কিছুই জানেন না। চিন্তার কোন কারণ নেই, আপনাদের এই সমস্যা সমাধানে আমরা এই আর্টিকেল এর মাধ্যমে আখ চাষ পদ্ধতি এবং ইক্ষু বা কুশার অথবা আখ চাষের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবো।
আখ চাষ পদ্ধতি - আখের উন্নত জাত সমূহ
আখ একটি দীর্ঘ মেয়াদী এবং জনপ্রিয় অর্থকারী ফসল। আখ মূলত চিবিয়ে খাওয়া , চিনি এবং গুড়ের জন্য উৎপাদন বা চাষ করা হয়। বর্তমানে আমাদের দেশে আখ চাষ বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। চিনি এবং গুড়ের অতিরিক্ত দামের জন্য এখন অনেকেই আখ চাষ করছে। তাই সঠিক উপায়ে আখ চাষ পদ্ধতি এবং আখ চাষের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত দেওয়া হলো।

ভূমিকা

এই আর্টিকেল এর মাধ্যমে আমরা আপনাদের জানানোর চেষ্টা করব যে, আখ চাষের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি বা রোপা পদ্ধতিতে (STP) আখ চাষ , আখের বীজ তৈরির নিয়ম , আখের বীজ লাগানোর নিয়ম , আখ চাষের সময়কাল , আখের উন্নত জাত সমূহ , আখ চাষে সারের ব্যবহার নিয়ম।
এছাড়াও আখের সাথে আর অন্য কোন ফসল চাষ করা যাবে এবং আখ চাষে লাভ কেমন সহ আখ সম্পর্কিত সকল তথ্য। তাই আশা করছি আপনারা এই আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়বেন এবং আখ সম্পর্কিত সকল তথ্য গুলো জেনে নিবেন।

আখ চাষের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি বা রোপা পদ্ধতিতে (STP) আখ চাষ

সবচেয়ে উন্নত আখ চাষ পদ্ধতি হলো রুপা পদ্ধতিতে আখ চাষ। এ পদ্ধতিতে ধানের মত বীজ তলায় চারা উৎপাদন করে সেই চারা যে জমিতে আখ চাষ করবেন সেই জমিতে সঠিক উপায়ে রোপণ করা হয়। অর্থাৎ জমিতে সরাসরি চারা রোপণের পরিবর্তে চারা তৈরি করে সেই চারা জমিতে রোপন করাকে রুপা পদ্ধতি বলে। নিচে বিস্তারিত ভাবে রোপা পদ্ধতিতে আখ চাষ আলোচনা করা হলো।

মাটি নির্বাচন ও মাঠ বা জমি প্রস্তুতঃ আখ চাষ করার জন্য সবথেকে ভালো ও উপযুক্ত মাটি হল দোআঁশ মাটি। এছাড়াও এঁটেল-দোআঁশ মাটি এবংএঁটেল মাটিতেও আখ চাষ ভালো হয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে জমিতে আপনি আখ চাষ করবেন সেই জমি যেন, উঁচু এবং মাঝারি উঁচু জমি হয়। এছাড়াও জমিতে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা সহ পর্যাপ্ত পানি দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

আখ যেহেতু একটি দীর্ঘ মেয়াদী ফসল। তাই আখ চাষের আগে ৮ সেন্টিমিটার গভীর পর্যন্ত মাটি ৫-৬ টি ভালোভাবে চাষ এবং মই দিয়ে তৈরি করে নিতে হবে। এ সময় প্রতি একর জমিতে তিন থেকে চার টন গোবর সার বা জৈব সার দিয়ে চাষ করে নেওয়া ভালো।

কীটনাশক ব্যবহারঃ আখের পোকামাকড় ও রোগ ব্যবস্থাপনার জন্য নিয়মিত সঠিকভাবে কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। আখের লাল পচা রোগ থেকে বাঁচার জন্য ব্যাভিস্টিন নামক ছত্রাকনাশক বা গরম পানিতে বীজ শোধন ৩০ মিনিট করতে হবে।

আখের উইপোকা দমনঃ উৎপাদনে সবথেকে বড় বাধা উইপোকা। কারণ উইপোকা আখ রোপণের পরে আখের খন্ডগুলো খেয়ে ফেলে । ফলে আখের চারা গজাতে পারে না। এছাড়াও উইপোকা আখের গাছে লেগে আখগাছ শুকিয়ে ফেলে। আর তাই উইপোকার দমনের জন্য লিথাল বা ভিটাসিল্ড ২০ ইসি সঠিকভাবে অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
এছাড়াও লোকাল কিছু নিয়ম আছে যেমন, উইপোকার ডিপি খুঁজে বের করে সেখান থেকে রানী উইপোকা মেরে ফেলতে হবে এবং পাটকাঠির ফাঁদ দিতে হবে। এছাড়াও উইপোকা দমনের জন্য মুড়ি আখ চাষ করাবন্ধ করতে হবে।

আখের মাজরা পোকা দমনঃ আখ উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার পেছনে যে পোকা সব থেকে বেশি ভূমিকা পালন করে তা হল মাজরা পোকা। এই মাজরা পোকা আখের ডগা , কান্ড এবং গোড়াতে সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করে থাকে। আখের ডগার মাজরা পোকা দমনের জন্য কার্বো ফুরাণ জাতীয় কীটনাশক পুরাটার ৫ জি অথবা ফুরাডান ৫ জি সঠিকভাবে অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।

এছাড়া আখের কাণ্ডের মাজরা পোকা দমনের জন্য কারটাপ গ্রুপের রাজেক্স ৪ জি সঠিকভাবে অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। এবং আখের গোড়ার মাঝরা পোকা দমনের জন্য ক্লোরো-পাইরিফস গ্রুপের ডারসবান জাতীয় কীটনাশক সঠিকভাবে অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।

আখের পরিচর্যাঃ নিচে বিস্তারিতভাবে আখের পরিচর্যা আলোচনা করা হলো।
  • আখ যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি ফসল তাই আখের জমিতে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত শেষ দিতে হবে।
  • এছাড়াও আখের জমিতে আগাছা হলে সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে।
  • আখ গাছের যে পাতাগুলো শুকনো সে পাতাগুলো ছিড়ে ফেলতে অথবা কেটে ফেলতে হবে।
  • আকাশ বড় হয়ে গেলে মাটিতে যেন না পড়ে যায় বা ঝড়ে যেন না পড়ে যায় সেজন্য কয়েকটি আখ গাছ একত্রে করে বেঁধে দিতে হবে।
  • আখের জমির মাটিতে যেন সঠিকভাবে অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেন চলাচল করতে পারে সেজন্য মাঝে মাঝে মাটি আলগা করে দিতে হবে।
  • আখ গাছে যেন পোকামাকড় না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • আখের জমিতে যেন উইপোকা না লাগে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
  • প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক এবং সার সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

আখের বীজ লাগানোর নিয়ম

আখে বীজ লাগানোর জন্য আখের জমিতে এক মিটার দূরে দূরে নালা তৈরি করতে হবে। নালার গভীরতা হতে হবে ৩০ সেন্টিমিটার , উপরের প্রস্থ হতে হবে ৩০ সেন্টিমিটার এবং নিচের প্রস্থ হতে হবে ২৫ সেন্টিমিটার। এছাড়াও নালা নিচের দিকে ৫ থেকে ৭ সেন্টিমিটার গভীরতায় আখের বীজ রোপণ করতে হয়।
এবং উপরের মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। নালা আস্তে আস্তে মাটি দ্বারা ভরাট হওয়ার ফলে গাছের গোড়া মজবুত এবং ভালোভাবে মাটিতে আটকে থাকে। যার জন্য ঝড় বা বাতাসে আর সহজে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে না। এবং এর ফলে আখের উৎপাদন অনেক বেশি হয়।

আখ চাষের সময়কাল

বর্তমান সময়ে আখ চাষের সময়কাল বলতে কিছুই নেই। কারণ বর্তমানে আখ বাংলাদেশ সারা বছরই চাষ করা হয়ে থাকে। তবে আখ চাষের সর্বোত্তম সময় হলো সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাস এরমধ্যে। এবং আখের ফসল সংরক্ষণ করা হয় ১২ থেকে ১৫ মাস এর মধ্যে।

আখের উন্নত জাত সমূহ

বাংলাদেশে আখের অনেক ধরনের জাত দেখা যায়। তবে নিচে আখের উন্নত জাতসমূহ দেওয়া হল। আখের উন্নত জাত গুলোর মধ্যে রয়েছে,ঈশ্বরদী-২০, ঈশ্বরদী-২১, ঈশ্বরদী-২২, ঈশ্বরদী-২৪, ঈশ্বরদী-২৫, ঈশ্বরদী-২৬, ঈশ্বরদী-২৭, ঈশ্বরদী-২৮, ঈশ্বরদী-২৯, ঈশ্বরদী-৩০, ঈশ্বরদী-৩১, ঈশ্বরদী-৩২, ঈশ্বরদী-৩৩, ঈশ্বরদী-৩৪, ঈশ্বরদী-৩৭, ঈশ্বরদী-৩৮, ঈশ্বরদী-৩৯ এবং ঈশ্বরদী-৪০

আখ চাষে সারের ব্যবহার নিয়ম

আখ চাষের জন্য ইউরিয়া ১৩০-১৪০ কেজি , এমওপি ১০০-১৩০ কেজি , জিপসাম ৪০-৫০ কেজি , টিএসপি ৭০-১০০ কেজি , ডলোচুন ১১০-১৪০ কেজি , সালফেট ১০-১২ কেজি এবং জৈব সার ৫ থেকে ৬ টন প্রতি একর জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। এরমধ্যে ইউরিয়া এবং এমওপি সার ছাড়া বাকি সবগুলো সার জমি চাষ করার সময় মাটিতে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে।

আর ইউরিয়া এবং এমওপি সার অর্ধেক পরিমাণ আখের চারা রোপন করার পর নালায় দিতে হবে এবং বাকি অর্ধেক আখের খুশি গজানোর পর অর্থাৎ আখ রোপনের ১৩০-১৪০ দিন পর আখের উপর প্রয়োগ করতে হবে।

আখের সাথে আর অন্য কোন ফসল চাষ করা যাবে

আখ একটি দীর্ঘমেয়াদী ফসল হওয়ায় এই দীর্ঘ সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। আর তাই আখের পাশাপাশি অন্য আরেকটি স্বল্পমেয়াদি ফসল সঠিকভাবে চাষাবাদ করা যেতে পারে। আখের সাথে অন্য ফসল হিসেবে আমরা ডাল জাতীয় ফসল যেমন, ছোলা , মুসুর , মটরশুটি ও মুগ ডাল চাষাবাদ করতে পারি। এছাড়াও আখের সাথে মসলা জাতীয় ফসল যেমন, পেয়াজ , আদা ও রসুন চাষাবাদ করা যেতে পারে। আর তেল জাতীয় ফসলের মধ্যে সরিষা , বাদাম , তিল এবং তিসি চাষাবাদ করা যায়।

আখ চাষে লাভ কেমন

বর্তমানে দেখা যায় প্রতিবিধান জমিতে আখ চাষ করতে মোটামুটি ভাবে ৩০০০০-৪০০০০ টাকা খরচ হয়ে থাকে। তবে সঠিক উপায়ে আখ চাষ করতে পারলে এক বিঘা জমিতে১৮০০০০-২২০০০০ টাকার আখ বিক্রি করা সম্ভব। আর এই হিসাব অনুযায়ী এক বিঘা জমি থেকে মোটামুটি ১৫০০০০-১৮০০০০ টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব।

শেষ কথা

প্রিয় পাঠক এই আর্টিকেল এর মাধ্যমে আমরা আপনাদের জানানোর চেষ্টা করেছি যে, আখ চাষের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি বা রোপা পদ্ধতিতে (STP) আখ চাষ , আখের বীজ তৈরির নিয়ম , আখের বীজ লাগানোর নিয়ম , আখ চাষের সময়কাল , আখের উন্নত জাত সমূহ , আখ চাষে সারের ব্যবহার নিয়ম . আখের সাথে আর অন্য কোন ফসল চাষ করা যাবে এবং আখ চাষে লাভ কেমন সহ আখ সম্পর্কিত সকল তথ্য।
তাই এই আর্টিকেলটির মাধ্যমে আপনাদের যদি কোন উপকার হয়ে থাকে বা ভালো লেগে থাকে তবে অবশ্যই, এই আর্টিকেলটি আপনারা আপনাদের বন্ধু-বান্ধবের সাথে শেয়ার করবেন এবং আমাদের এই ওয়েবসাইটটি নিয়মিত ফলো করবেন।

ধন্যবাদ

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

Club Solver এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url